রম্য রচনা : অবশেষে কোরবানী রম্য রচনা : অবশেষে কোরবানী – দৈনিক মাতৃকণ্ঠ
শুক্রবার, ২৩ অগাস্ট ২০১৯, ১১:২৪ পূর্বাহ্ন
Logo
সংবাদ শিরোনাম ::
বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিমান বহরে তৃতীয় ড্রিমলাইনার গাংচিল উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী রাজবাড়ী পৌরসভার উদ্যোগে ডেঙ্গু প্রতিরোধ বিষয়ক মতবিনিময় সভা শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসকের বাণী রাজবাড়ী থেকে চুরি হওয়া পালসার মোটর সাইকেল বোয়ালমারী থেকে উদ্ধার॥গ্রেপ্তার-৮ রাজবাড়ীর শহীদওহাবপুরের ড্রেজার চালক ইলিয়াছকে ইয়াবা দিয়ে ফাঁসানোর প্রতিবাদে শোচ্চার এলাকাবাসী রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসকের সাথে একুশে পদকপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পী মনসুর-উল-করিমের সাক্ষাৎ যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীদের পাঠাগারমুখী করতে হবে—রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক দিলসাদ বেগম খানখানাপুরে ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালে তুহিন স্মৃতি সংঘ বিজয়ী আমিরাতে ‘গোল্ডেন ভিসা’ পেলেন একই পরিবারের তিন বাংলাদেশী রাজবাড়ীতে হ্যান্ডকাপসহ পালিয়ে যাওয়া দুই আসামী পৌরসভার পুকুরে থেকে পুনরায় গ্রেফতার

রম্য রচনা : অবশেষে কোরবানী

  • আপডেট সময় মঙ্গলবার, ২১ আগস্ট, ২০১৮

## এডঃ লিয়াকত আলী ## অত্যন্ত রাসভারী চেহারার ইঞ্জিনিয়ার হাসান জাহিদ সাহেবের সামনে হাসি খুশি মুখে বসে আছেন ফার্স্ট ক্লাস কন্ট্রাক্টর বিল্লাল হোসেন ওরফে বিলু কন্ট্রাক্টর। ঈদের সামনে বিলটা পাশ না হলে বিল্লাল সাহেবকে হালের হট আইটেম গুম কিংবা পলাতক হওয়া ছাড়া আর কোন পথই খোলা থাকবে না। বিল্লাল সাহেব নিজের হাত দুইখানা নিজে নিজেই কচলিয়ে লাল করে ফেলেছেন।
স্যার একটা কথা জানতে পারি? ইঞ্জিনিয়ার সাহেব বাম দিকে মাথা নুইয়ে কথা বলার সম্মতি দিলেন। বিল্লাল সাহেব আরও জোরে জোরে হাত কচলাতে কচলাতে গদগদ কণ্ঠে বললেন ঃ স্যার কি কোরবানীর গরু কিনে ফেলেছেন? হাসান সাহেব এতক্ষণ পর মাথা উঁচু করে বললেন- মানে কি? ভারী চশমার ফাঁক দিয়ে বিল্লাল সাহেবের দিকে এমনভাবে তাকালেন তাতে বিল্লাল সাহেবের কলিজা কেঁপে উঠলো। বিল্লাল সাহেব ভুলেই গেছিলেন যে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব গত বৎসর হজ্জ্ব করে এসেছেন। সেই ইঞ্জিনিয়ার সাহেবকে আকার-ইঙ্গিতে ঘুষের কথা বলা মানেই কবিরা গোনাহ্র কাজ। কিন্তু বিল্লাল সাহেবের এ ছাড়া আর কোন উপায়ও ছিল না। ঈদের আগে যেভাবেই হোক বিলটা পাশ করাতেই হবে। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব ভারী কণ্ঠে জানতে চাইলেন অফিসে এসে কোরবানীর গরুর গল্প উঠলেন কেন? বিল্লাল সাহেব আরো জোরে জোরে হাত কচলাতে কচলাতে বললেন ঃ স্যার যাই বলেন না কেন কোরবানীর গরুর হাট থেকে গরু কিনে এনে কোরবানী দেওয়া বড়ই একটা ঝক্কি ঝামেলার ব্যাপার। তবে আমার কাছে একটা ভালো ষাঁড়ের খোঁজ আছে। ইনজেকশন ছাড়া ষাঁড় স্যার। পিওর বোটানিক্যাল পদ্ধতিতে লালন-পালন করা হচ্ছে। স্যার একটু অনুমতি দিলেই ষাঁড়টা আপনার করিডোরে পুশইন করিয়ে দিতে পারি। অন্ততঃ কোরবানীর মত একটা বড় ধরনের ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়ে যাবেন। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব চশমাটা টেবিলে নামিয়ে মাথা চুলকাতে লাগলেন। এতক্ষণ পর বিল্লাল সাহেবের বুক ধরপর করা ভাব কিছুটা কাটতে শুরু করেছে। শরীরে ঘামটাও বন্ধ হওয়ার পথে। হাসান সাহেব টেবিলের উপর চশমাটা নামিয়ে টেবিলের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে দুই হাত দিয়ে মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললেন দাম পরবে কেমন? স্যার দাম খুব একটা বেশী হবে না। ওরা কল মানি বলেছে এক লক্ষ পঁয়ত্রিশ হাজার। আমি স্যার এক লক্ষ পাঁচ হাজার অথবা এক লক্ষ দশের মধ্যে ভাও করে ফেলতে পারবো। হঠাৎ হাসান সাহেব মাথা উঁচু করে চোখ বড় বড় করে বললেন-এক লক্ষ পয়ঁত্রিশ হাজার—? তাও বলছেন দাম কম? বিল্লাল সাহেব সর্বশেষ টিকে থাকা বাইশটা দাঁত বের করে বললেন- স্যার কোরবানীর গরু এখন বিশ-পঁিচশ লক্ষ টাকাতেও বিক্রি হচ্ছে। আর এতো সামান্য এক লাখের কিছু উপরে। তবে স্যার আপনি এ বিষয়টা নিয়ে একদম টেনশন করবেন না। যা যা করা দরকার সবই আমি করে দিতে পারবো স্যার। স্যার এদিক-ওদিক মাথা দুলিয়ে নেগেটিভ সাইন দেখাতে লাগলেন। বিল্লাল সাহেব আবার ঘামতে শুরু করবেন ঐ মুহূর্তে স্যার বললেন- না বিল্লাল সাহেব, না। ছেলেপেলে সাথে নিয়ে কোরবানীর হাট থেকে গরু কেনার মধ্যে একটা আলাদা থ্রিল কাজ করে। নাকি বলেন বিল্লাল সাহেব? তাতো বটেই স্যার। বিল্লাল সাহেবও স্যারের কথায় সায় দিলেন। তাহলে স্যার আমরা হাটে গিয়ে গরু কেনার ব্যবস্থা করে ফেলি? স্যার আপনি একদম চিন্তা করবেন না। এক কথায় নো টেনশন। আমি সব ম্যানেজ করে ফেলবো স্যার, আপনি শুধু ছেলেপেলেদের সাথে নিয়ে হাটে গিয়ে গরুটা নিয়ে আসবেন। হাসান সাহেব তাতেও রাজী হলেন না। হাসান সাহেবের ইঙ্গিত খুবই সোজা। আর সেটা হলো গরু কেনার টাকাটা হাসান সাহেবের হাতে আসতে হবে। তবে হাসান সাহেব টাকা নেওয়ার ব্যাপারে কখনোই ডাইরেক্ট কিক করতে চান না। তিনি সব সময়ই ইনডাইরেক্ট ফ্রি কিকে অভ্যস্ত। বিল্লাল সাহেব বললেন- স্যার কোরবানীর টাকাটা যদি আমাকে দেওয়ার সুযোগ করে দিতেন তাহলে ধন্য হতে পারতাম। হাসান সাহেব বিল্লাল সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন- বিল্লাল সাহেব মনে রাখবেন যে কোরবানী একটা ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয়। কারো অনুদানে কোরবানী হয় না। বিল্লাল সাহেব ধীরে ধীরে বুঝতে পারছিলেন যে স্যারকে এই টোপ গিলানো যাবে। বিল্লাল সাহেব একটু নড়ে চড়ে বসলেন। কারণ ডেল কার্নেগী আর ভারতের শিব-খোরার সব ধরনের তত্ত্ব-তথ্য তার মুখস্থ প্রায়। স্যার এটাতো অনুদান নয়। ছোট ভাইয়ের একটা ছোট্ট উপহার মাত্র। উপহার কখনোই পাপ-তাপের অংশ হয় না স্যার। হাসান সাহেব একটু নীচু কণ্ঠে বললেন- তবু একটা কথা থেকে যায় বিল্লাল সাহেব, একটা কথা থেকেই যায়। এতক্ষণে বিল্লাল সাহেব বুঝে ফেলেছেন যে এটাই হচ্ছে একটা মোক্ষম সুযোগ। বিল্লাল সাহেব আরেকটু নড়েচড়ে বসেলেন। স্যার, আপনি মনের মধ্যে কোন ক্লেদ রাখবেন না। কারণ আমি সামান্য একটু উপহার দিলেও আপনিতো আর এমনিতেই সেটা গ্রহণ করছেন না। আপনি সারা রাত ধরে আমার বিলের কাজটা করে দিয়ে শারীরিক শ্রমের একটা সামান্য উপহার নিচ্ছেন এতে পাপের কি আছে স্যার? হাসান সাহেব হাল্কাভাবে একটু হাসি দিয়ে বললেন- এ কথাটা সত্যি ঠিক এবং আপনার কথায় বলা চলে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচী আর কি। তো ঠিক আছে বিল্লাল সাহেব আপনার কথাই থাকলো। আগামী পরশু দিন বাসা থোকে সোজা গাবতলী হাটে চলে যাবো, না কি বলেন বিল্লাল সাহেব? বিল্লাল সাহেব মেঘে ঢাকা সূর্য দেখতে পেলেন। তিনিও একটু ফরমাল হাসি দিয়ে বললেন স্যার, আগামী কাল সকালেই ‘ওয়ান টুয়েনটি ফাইভ হাতে পেয়ে যাবেন স্যার। ওয়ার্ড ইজ ওয়ার্ড স্যার। তাহলে স্যার আমার বিলটাতে কি আজই হাত দিতে পারবেন? যদিও আপনার খুব কষ্ট হবে স্যার তবু আমাকে একটু বাঁচিয়ে নিতে হবে। হাসান সাহেব কিছুক্ষণ অন্যমনস্ক হয়ে থাকলেন। তারপর চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন- ওকে বিল্লাল সাহেব, কালকে দুপুর বারোটার মধ্যে আসতে হবে কিন্তু, বারোটার মধ্যে না আসলে আমাকে পাওয়া যাবে না। বিল্লাল সাহেব হঠাৎ স্যারের ডান হাতখানা চেপে ধরে বললেন- স্যার আমি সাড়ে দশটার মধ্যে আপনার কাছে চলে আসবো ইনশাল্লাহ। আমার দিকে একটু তাকালেই আমি বেঁচে যেতে পারবো স্যার। হাসান সাহেব বিল্লাল সাহেবের কাঁধের উপর হাত রেখে বললেন- লাইক ইউ-ওয়ার্ড ইজ ওয়ার্ড। ও কে থ্যাঙ্ক ইউ। এ কথা বলেই হাসান সাহেব অজু করার জন্য ওয়াশ রুমে ঢুকে পড়লেন। পরের দিন দুপুর ঠিক পৌনে বারোটার মধ্যে বিল্লাল সাহেব হাসান সাহেবের অফিস রুমে ঢুকেই আঁতকে উঠলেন। হাসান সাহেবের রুমে দুইজন পুলিশ অফিসার বসা। তাহলে কি? না, তা হয় কিভাবে। হাসান সাহেব বিল্লাল সাহেবকে ইশারায় বসতে বললেন। হাসান সাহেবের মুখটা গম্ভীর। বিল্লাল সাহেবের ভয় কাটছে না। প্রায় পনের মিনিট কেটে যাচ্ছে। অবশেষে বোঝা গেল পুলিশ অফিসার হাসান সাহেবের আত্মীয়। পারিবারিক বিষয় নিয়ে বসেছিল। বিল্লাল সাহেব আসাতে আলোচনায় ছেদ পড়ে। পুলিশ অফিসার চলে যাওয়ার পর হাসান সাহেব হেসে দিলেন। এতক্ষণ পুলিশ অফিসারের কারণে হাসান সাহেব মুখ ভার করে রেখেছিলেন। বিল্লাল সাহেব টাকার প্যাকেটটা হাসান সাহেবের হাতে দিতেই হাসান সাহেব এমন একটা হাসি দিলেন যা এতই বিরল হাসি যে ঐ রকমের হাসি এক যুগে একবার দেখা যায়। হাসান সাহেব টাকাটা নিয়ে সোজা ব্যাংকে চলে গেলেন। তারপর ম্যানেজার সাহেবকে বললেন ঐ টাকা গুলো রেখে ঐ টাকার নতুন নোট দিতে। ম্যানেজার সাহেবের সাথে হাসান সাহেবের বহু দিনের সখ্যতা। ম্যানেজার সাহেব হাজার আর পাঁচশত টাকার নতুন নোটের বান্ডিল হাসান সাহেবের হাতে ধরিয়ে দিলেন। যাক বাঁচা গেল। হাসান সাহেব আর কোন দিনও ঘুষের টাকা বাসায় নিবেন না মর্মে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন। টাকা বদলিয়ে নেওয়াতে ডাইরেক্ট ঘুষের টাকা বাড়ীতে নেওয়া হলো না।
আজ গাবতলীর শেষ হাট। হাসান সাহেব তার দুই ছেলেকে নিয়ে গাবতলীর হাটে গিয়ে হাজির। ব্যাগ ভরা টাকা। গরু হাতাহাতি চলছে। সর্বশেষ এক লক্ষ পাঁচ হাজার টাকায় গরু মিলে গেল। খুবই তরতাজা গরু। শিং দুটো ভয়ানক ধারালো। হাসান সাহেবের দুই ছেলে গরুর দুই দিকে রশি ধরেছে আর হাসান সাহেব পেছনে পেছনে গরুটিকে তাড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তাড়া পেয়ে গরু নিজে নিজেই পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে গরু হাসান সাহেবের বাসা চেনে। সন্ধ্যা নেমে আসছে। দিন থাকতে থাকতে বাসায় যাওয়া যাচ্ছে না। হাসান সাহেবের বাসা বসুন্ধরায়। এখন সবেমাত্র মিরপুর দশ নম্বর পার হচ্ছে। কালশি হয়ে তিনশত ফুট রাস্তা দিয়ে হাসান সাহেব বাসায় যাবেন। হঠাৎ গরুটি দৌড়ের মতো করে হাঁটতে শুরু করে দিলো। গরুটি ধরে রাখা যাচ্ছে না। যাচ্ছে না তো যাচ্ছেই না। গরু নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। না, সাথে লোক রাখা দরকার ছিল। ছেলে দুটো পেরে উঠছে না। ধীরে ধীরে তারাও হাফিয়ে উঠছে। শেষ রক্ষা বোধহয় হলো না। যা বাবা, হাসান সাহেব যা ভেবেছিলেন সর্বশেষ তাই হয়ে গেল। গরুটি এক দৌড়ে রাস্তার ঐ পাশে চলে যাওয়ার পরই সামনে দিয়ে ট্রাকের সারি বেধে গেলো। গরুটির দৌড় ছিল ৯০ কিঃ মিঃ বেগে। মুহূর্তের মধ্যেই গরুটি হাওয়া হয়ে গেল। অবশেষে হাসান সাহেবের আর কোরবানী দেওয়া হলো না। এবার তিনি নিজেই কোরবানী হয়ে গেলেন। লেখক ঃ কলামিষ্ট ও রাজনীতিবিদ।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো খবর
error: আপনি নিউজ চুরি করছেন, চুরি করতে পারবেন না !!!!!!